পল্লী প্রকৃতির প্রসারিত প্রান্তর, ইতিউতি চরে বেড়ানো ছাগল আর কাছেই কোন ঝাঁকড়া বৃক্ষতলে বৃদ্ধ মনিবের উদাসীন নজরদারি। গ্রাম্য দুনিয়ার চিরন্তন দৃশ্যপট। হালকা লাঠির আলগা শাসনে শান্তির সহবাস। সারা সকাল সহবত সহকারে অন্ন-অন্বেষণ তারপর সাঁঝবেলায় মাঠ ছেড়ে ঘরের ঘেরাটোপে সরল যাপন। এহেন সুভদ্র, সামাজিক জীবের উল্লাস উধাও তা নয়, তবে পরিমিত। অল্প আলাপী, স্বল্প জিজ্ঞাসু, কিছুটা চটপটে, কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন-এটাই বকরী বৈশিষ্ট্য।
ছেড়ে দিলে ছড়িয়ে পড়ায় অভ্যস্ত ছাগলের আনাগোনা মানুষের সংসারে সাম্প্রতিক নয়। অনুমানে হাজার দশেক বছর আগেই ইরানে গৃহপালিত। পুরনো পৃথিবীর প্রচুর গল্পে তার বিচরণ। গ্রীক পুরাণে জলপরী আমালথিয়া ছিলেন জিউসের ধাত্রী, যিনি তাঁকে ছাগদুগ্ধ পান করাতেন। জার্মানীর বজ্রদেবতা থরের রথ টানতো বকরী বাহিনি। ভারতে ছাগলমুখো দক্ষরাজার দুঃখ-কাহিনি আজও কথিত। এখনোও ফিনল্যান্ড অঞ্চলে জানুয়ারির বিশেষ দিনে শিশু কিশোরেরা Goat সেজে ঘরে ঘরে ঘোরে, যাকে ‘নুটিপুক্কি’ উৎসব বলে।
পরশুরামের রচনা ‘লম্বকর্ণ’এ হাসিরাশির আবহে মনুষ্য-মনুষ্যতর প্রাণীর সখ্যতা-সম্পর্কের বৈচিত্র্য বিন্যাস বিমুগ্ধ করে। জমিদারের অগুন্তি সাহেব-নায়েব, ঝি-চাকর, দারোয়ান-কোচোয়ান হাজিরার মাঝেও একাকিত্বের আভাষ, দাম্পত্য কলহের লঘু ওঠানামা। মধ্য বয়সে শারীরিক মোটাপা, মানসিক বিড়ম্বনার আবহে হঠাৎ হাজির লম্বকর্ণ। কুচকুচে কালো, লটপটে কান, পটলাকৃতি শিং সমাদৃত পাঁঠার প্রেমে পড়লেন রায়বাহাদুর। প্রতিবেশীর লোলুপ রসনা, গিন্নির অগাধ অসহযোগিতা সত্ত্বেও মহব্বতে মন্দা পড়েনি। অবশেষে ঝড়ের বিকেলে বাবুর বেঘোরে জান যাওয়ার দশায় দিশা দেখালো চারপেয়ে তৃণভোজী। বাঁচলো বংশলোচন, টিঁকলো সহানুভূতি।
ছাগলে কিনা খায়, বাস্তবে যেকোন উদ্ভিতজাত পদার্থই চেবোতে চায়, সেটা পিচবোর্ড, কাগজ, পোশাক বা বংশলোচনের বই, চুরুট, লাটুবাবুর ঢোলের চামড়া, বেহালার দড়ি বা হারমোনিয়ামের চাবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবাঞ্ছিত আগাছা পরিষ্কারে প্রসিদ্ধ ছাগলের ব্যবহার। পাহাড়ের ঢাল সাফা রেখে ভূমিক্ষয় রোধ, উর্বরতা বৃদ্ধি করে এই সহিষ্ণু জাবরকাটা জীবেরা। শিশুকে ‘ছাগল’ বলে গালি দিলেও গবাদিটি কিন্তু অশেষ উপকার করে তার সর্বস্ব দিয়ে। মানুষকে মেনে নেওয়ার প্রবৃত্তিতে অনবদ্য প্রাণীটি আমাদের জীবনযাত্রার জৌলুস বাড়িয়েছে।
বর্তমানে বিবিধ কারণে মনের চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা বাড়ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে অনেকেই বিকল্প পদ্ধতি খুঁজছেন। যার নব্য নমুনা ছাগল থেরাপি (Goat Therapy), একটি প্রাণী-সহায়ক থেরাপি যেখানে ছোট্ট বন্ধুসুলভ ছাগলদের ব্যবহার করা হয়। মূলত মার্কিন মুলুকে একদশক পূর্বে প্রচলিত। এই সহজ প্রক্রিয়ায় যোগব্যায়ামের সময় ছোট্ট চঞ্চল ছাগলেরা অংশগ্রহণকারীর সান্নিধ্যে আসে, পিঠে উঠে বসে। এতে অনেকের একাকীত্ব কমে, সামাজিক হবার প্রবণতা বাড়ে, আবেগীয় স্তরে উন্নতি আসে। কিছু ঘাস, অল্প ছায়া, গুটিকয় সঙ্গীর সাহচর্যে সরল জীবনের সহজ যাত্রাটা শিক্ষণীয়। যেটা আছে সেটার জন্য কৃতজ্ঞতা, অনভ্যস্ত পথেও ধৈর্য, সহনশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ। ছাগলের সাথে খেলাধুলা হৃদচাপ কমায় যা অক্সিটোসিন, এন্ডরফিন বাড়িয়ে ভালো অনুভূতির আমেজ আনে। ওষুধ ছাড়াই যদি বন্ধুসুলভ প্রাণীর স্পর্শে যাতনা লাঘব হয় ক্ষতি কি? আর গ্রাম বাংলায় সহজেই মেলে এই পালিত প্রাণীর উদার উপস্থিতি। তাই সুযোগ পেলে সাদরে আদর…





