শীতের শুরুতেই শহর-শহরতলীর নার্সারিগুলোয় ভিড় জমে। ফুলের আঁতুরঘর। জন্ম নেওয়া, জেগে ওঠার মায়াবী ঘেরাটোপ। চারপাশে মুগ্ধতা ছড়ানোর পূর্বে প্রস্তুতির আশ্রম। বেড়ার বাইরে যতই শোরগোল হোক, ভিতরে এলেই ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’। এক বিস্ময়ের দেশে অলৌকিক অভিযান।
রামধনুর রাজ্যে রকমারি রঙের রূপসজ্জা। সৌন্দর্য ঝাঁপি উপুড় করে ঢালা। লম্বা ডাঁটায় সাজানো খাপখোলা তলোয়ার ‘গ্লাডিওলাস’-এর রাজকীয় উপস্থিতির পাশেই রয়েছে ‘গডেশিয়া’, যা মখমলের মতো মোলায়েম, মসৃণ পাপড়িগুলো আশ্রয় নিয়েছে ঘন্টার বুকে। অনেকটা সূর্যমুখীর মতো রোদ্দুরপ্রিয়া রোদেলা বা ‘গজানিয়া’ বর্ণ বৈচিত্র্যে চোখ ধাঁধানো। লিলি বা ‘লিলিয়াম’ গন্ধ, রঙ, আভিজাত্যে ভিন্ন, অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যা ব্যাপক ব্যবহৃত। এর সৌন্দর্য কেবল আঁখিতে নয়, হৃদয়ের গভীরেও ছাপ রেখে যায়। পাশাপাশি ‘সালভিয়া’র চরিত্র অনেকটা একই-উজ্জ্বল, সুগন্ধি, দীর্ঘস্থায়ী। খানিকটা পুদিনা পরিবারের মতো। প্রজাপতি, মৌমাছির প্রিয় পুষ্প। দৃষ্টিনন্দন ‘সেলোসিয়া’ যাকে আমরা মোরগফুল বলি, যার আগুনে আভা গোটা গ্রীষ্ম-শরৎ জুড়ে থাকে। রঙে, প্রাণে, উচ্ছ্বাসে ভরপুর রোমান্টিক ‘ইনকা’, গোলাকার ‘জিনিয়া’, ঝোপাকৃতি ‘জেরেনিয়াম’, সুঘ্রাণময় ‘অজেলিয়া’, পদ্মকুলি ‘টোরেনিয়া’, গুচ্ছবদ্ধ ‘অ্যালিসাম’, ওষধিগুণী ‘ডিজিটালিস’, গোলাপের মতো ‘ডায়ানথাস’, গাঢ়বৃত্তের ‘ভেনিন্ডিয়াম’, ফানলাকৃতি ‘পেটুনিয়া’,পাতলা ‘পপি’, অজস্র অজস্র নাম। মমতা, যত্ন, নিরাপত্তার নিবিড় আলয় নার্সারিগুলো। মায়ের কোলে শিশুর মতো সমাদরে বীজ বেড়ে ওঠে। ধৈর্যের ধারাপাত মুখস্ত রাখতে হয় বাগান কর্মীদের। প্রতীক্ষিত পরিশ্রম করতে করতে সঠিক সময়ে সফলতা আসে। মনোযোগের ভক্তি আর সেবার শক্তি ছাড়া বৃক্ষ বাঁচবে না। বিকশিত হবে না। নবাঙ্কুরের দেখা, কচি পাতার রেখা, মুকুলিত শাখা সবের পেছনেই রুটিন মাফিক সচেতন মেহনত। বীজ থেকে ফুল- যত্নে গড়া প্রাণ, মাটির বুকে আঁকা মধুর ঐকতান।
জীবনের মাধুর্য বৈচিত্রের মধ্যে নিহিত। ভিন্নতাকে সম্মান না করলে বাহার বোঝা সম্ভব না। কাজ ছোট বড় নয়, যে যার সুবিধামতো, সাধ্যমতো শ্রম করুক আলোর দিকে মুখ রেখে। ছোট ছোট ফুল যেমন সমগ্র বাগানকে উজ্জ্বলতায় ভরিয়ে তোলে তেমনি আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানবিক, সমাজিক প্রচেষ্টাও পৃথিবীতে আরেকটু বাসযোগ্য করে তুলবে। সহানুভূতির মন আর সহযোগিতার হাত বাড়ালে বীজ বৃক্ষে আর বৃক্ষ বনে পরিণত হবে।আবারো ফুল ফুটবে, বৃষ্টি নামবে, পাখি উড়বে, পূরণ হবে সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন। আমাদের সন্তান-সন্ততিরা বিষহীন বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে।





